বিশ্বকে রক্ষা করেছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন
সুপ্রতীপ রায়
একথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৩১ সালের মার্চ মাসে জাপানী ফ্যাসিষ্ট শক্তি মাঞ্চুরিয়া আক্রমন করে কার্যত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেছিল। আর এই আক্রমন সম্পর্কে রাষ্ট্রসংঘে ব্রিটিশ প্রতিনিধি বলেছিলেন, ভারতবর্ষে আমাদের যেমন অধিকার আছে, মাঞ্চুরিয়াতেও জাপানের তেমনি অধিকার আছে।ফ্যাসিস্ট জাপানের এই আক্রমণের বিরুদ্ধে তৎকালীন সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিন লিটভিনডের বলেছিলেন: একটা দেশে যুদ্ধের আগুন জ্বলতে দিলে ক্রমে সে আগুনে সারা পৃথিবীই পুড়বে।আক্রমণকারীকে শায়েস্তা করার একমাত্র রাস্তা যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আসুন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমরা একজোট হয়ে দাঁড়াই। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদের যুদ্ধ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ৫ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিলেন, ২০কোটি মানুষ পঙ্গু হয়েছিলেন। কিন্তু ফ্যাসিবাদ যে অপ্রতিরোধ্য নয়, তা প্রমান করেছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৩৩ সালে হিটলার জার্মানিতে ক্ষমতা দখল করে। আর ঐ বছরই (৬ফেব্রুয়ারি) বিশ্ব নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে, সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমনাত্মক যুদ্ধ প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ ধিক্কার জানানোর প্রস্তাব আনে। ব্রিটিশ প্রতিনিধি এ্যান্টনি ইডেন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন শান্তির পক্ষে, ফ্যাসিবাদী আক্রমনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল।১৯৩৫সালের ২অক্টোবর ইতালি আবিসিনিয়া আক্রমন করলে রাষ্ট্রসংঘে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার তীব্র সমালোচনা করে। কিন্তু ইংল্যন্ড ও ফ্রান্স ফ্যাসিবাদ তোষন নীতি নিয়ে চলে। ১৯৩৬ সালে স্পেনের পপুলার ফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে মুসোলিনি ও হিটলারের সাহায্যপুষ্ট ফ্যাসিষ্ট প্রতিবিদ্রোহ হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন স্পেনের প্রজাতন্ত্রী সরকারকে সর্বাত্মক সাহায্য করৈ।১৯৩৬ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন স্পেনের পপুলার ফ্রন্ট সরকাকে ২৩ জাহাজ ভর্তি অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করেছিল।এপ্রসঙ্গে কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার হয় ১৯৩৬ সালের অক্টোবর মাসে স্পেনের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারন সম্পাদক যোগে দিয়াজের কাছে স্তালিন প্রেরিত এক তারবর্তায়: “স্পেনের বিপ্লবী জনগণকে সাধ্যমতো সাহায্য করে সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগন তাদের কর্তব্য করেছে মাত্র। তারা জানে যে ফ্যাসিষ্ট প্রতিক্রিয়ার শোষণের কবল থেকে স্পেনকে মুক্ত করা শুধু স্পেনীয়দেরই কর্তব্য নয়, সারা পৃথিবীর সমস্ত প্রগতিশীল মানুষেরই কর্তব্য।” আর কোনো রকম হস্তক্ষেপ না করার নীতির আড়ালে ইংল্যন্ড ও ফ্রান্স কার্যত প্রজাতন্ত্রের বাইরের সাহায্য পাওয়া বন্ধ করেছিল।
১৯৩৭ সালে জাপানী ফ্যাসিবাদ চীনের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনের পাশে দাঁড়িয়েছিল। জাপানের বিরুদ্ধে ব্যাপক চুক্তির প্রস্তাব ইংল্যন্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতায় কার্যকর হয়নি।
ঘটনা পরম্পরার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিষ্ট শক্তি এটা নিশ্চিত হয়েছিল,ফ্যাসিষ্টদের পথের কাঁটা সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৩৬ সালের ২৫ নভেম্বর জার্মান ও জাপানী ফ্যাসিষ্টরা কমিউনিস্ট বিরোধী চুক্তি স্বাক্ষর করে।এই চুক্তির গোপন বলা ছিল, সোভিয়েতকে ধ্বংস করাই তাদের লক্ষ্য। ১৯৩৭ সালে ফ্যাসিষ্ট ইতালিও এই চুক্তিতে সই করে, যা রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষশক্তি নামে পরিচিত হয়।
ইংল্যন্ড, ফ্রান্স প্রভৃতি ধনবাদী রাষ্ট্রগুলি ফ্যাসিবাদকে তোয়াজ করে চলতে চেয়েছিল। একারনেই ১৯৩৮ সালের ১২ মার্চ হিটলার অষ্ট্রিয়া দখল করলেও ইংল্যন্ড ও ফ্রান্স আপত্তি করেনি। হিটলার চেকোস্লোভাকিয়া আক্রমন করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন সাহায্য করতে রাজী ছিল।কিন্তু চেকোস্লোভাকিয়া এই সাহায্য নিতে রাজী ছিল না।
১৯৩৯ সালের ৭এপ্রিল মুসোলিনি আলবেনিয়া দখল করে, ঐ বছরের ১৫মার্চ হিটলার চেকোস্লেভাকিয়ার দখল সম্পূর্ণ করে। সর্বোপরি ২৪মার্চ হিটলার পোল্যান্ডের ডানজিগ বন্দর দাবি করে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক মুহুর্তে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির অষ্টাদশ কংগ্রেসে স্তালিন খুব সঠিকভাবেই বলেছিলেন, “যুদ্ধবাজ নাৎসি দস্যুদের তোষণ করার নীতি গ্রহন করে পশ্চিমী শক্তিবর্গ নতুন যুদ্ধের আগুন জ্বালাচ্ছে। তারা চাইছে ফ্যাসিষ্ট আক্রমণকারীদের সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে লেলিয়ে দিতে।…..” ১৯৩৯ সালের ১৭ এপ্রিল যুদ্ধবাজ ফ্যাসিষ্ট প্রতিরোধে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রস্তাব দিয়েছিল-ইংল্যন্ড, ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক চুক্তির। সম্মত হয়নি ফ্রান্স ও ইংল্যন্ড। কিন্তু ওরা ফ্যাসিষ্ট বাহিনীর আগ্রাসন থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধল। ১৯৪০ সালে ফ্রান্স হিটলারের কাছে পরাজিত হল।
১৯৪১ সালের ২২ জুন হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমন করলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে শুরু হল চূড়ান্ত সংগ্রাম। চার বছর ধরে প্রায় দুই সহস্র মাইল বিশাল রণাঙ্গন জুড়ে চলল সে সংগ্রাম। চরম মূল্য দিয়ে কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন রুখে ছিল বিশ্বত্রাস হিটলিরকে, প্রায় দু’কোটি সোভিয়েত নাগরিক শহীদের মৃত্যু বরণ করেছিলেন।সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন রক্ষা করেছে মানব সভ্যতার ভবিষ্যতকে।
নভেম্বর বিপ্লব বার্ষিকীতে এ ইতিহাস আমরা স্মরণ করছি। আর একবার দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারন করি, সাম্যবাদী মতাদর্শই শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আর এই মতাদর্শই জয়ী হয়েছিল নভেম্বর বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে।
